
চলুন, বিষয়টি বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করি। কেন এমন হচ্ছে? সম্ভাব্য কারণসমূহ:
আপনি যা বলছেন, "কোনো কারণ ছাড়াই" এবং "ব্রেন স্টক করে মারা যাবো" - এই দুটি বিষয়ই প্যানিক অ্যাটাকের সাথে খুব মিলে যায়।
১. প্যানিক ডিসঅর্ডার: এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থা যেখানে বারবার প্যানিক অ্যাটাক হয়। প্যানিক অ্যাটাক হলো তীব্র ভয়ের একটি আকস্মিক পর্ব, যা মিনিটের মধ্যে চরমে পৌঁছায়। এই সময় আপনার মনে হতে পারে আপনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন, হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে বা মৃত্যু হতে চলেছে। এটি প্রায়ই কোনো আপাত ট্রিগার ছাড়াই ঘটে।
- শারীরিক উপসর্গ: এই আক্রমণের সময় শুধু ভয়ই লাগে না, বরং এর সাথে শক্তিশালী শারীরিক উপসর্গও থাকে, যেমন:
- দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (ধড়ফড় করা)
- প্রচণ্ড ঘাম হওয়া
- কাঁপুনি বা শিরশিরানি
- শ্বাসকষ্ট বা গলা আটকে আসার অনুভূতি
- বুকে ব্যথা বা চাপ
- বমি বমি ভাব বা পেট খারাপ
- মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম করা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভয়
- নিজের থেকে বা পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন লাগা
- নিয়ন্ত্রণ হারানোর বা পাগল হয়ে যাওয়ার ভয়
- মৃত্যুভয়
২. স্ট্রেস ও দুশ্চিন্তা:
দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মানসিক চাপ, কাজের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা আর্থিক দুশ্চিন্তা আপনার মনে না থাকলেও, অবচেতন মনে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলেও হঠাৎ করে এমন আক্রমণ হতে পারে। আপনি হয়তো সারাদিন ব্যস্ত থাকায় বাহ্যিকভাবে টেনশন টের পান না, কিন্তু শরীর ও মন তা অনুভব করছে।
৩. শারীরিক কারণ:
- থাইরয়েডের সমস্যা: বিশেষ করে অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন (হাইপারথাইরয়েডিজম) উদ্বেগ, ধড়ফড়ানি এবং অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
- হৃদরোগ: কখনো কখনো হার্টের ছোটখাটো সমস্যা বা অ্যারিদমিয়াও এমন অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
- নিম্ন রক্তে শর্করা (হাইপোগ্লাইসেমিয়া): রক্তে সুগার কমে গেলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং উদ্বেগ লাগতে পারে।
- প্যানিক অ্যাটাকের শারীরিক লক্ষণগুলি এতটাই তীব্র হয় যে ব্যক্তি মনে করেন এটি কোনো শারীরিক অসুস্থতা, যেমন হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোক। কিন্তু মূল সমস্যাটি মানসিক হলেও উপসর্গগুলি খুবই বাস্তব।
"মনে হচ্ছে আমি ব্রেন স্টক করে মারা যাবো" – এই ভয়টি আসলে কী?
প্যানিক অ্যাটাকের সময় অ্যাড্রেনালিন হরমোন অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়। এর ফলে:
• মাথা ঘোরা, হালকা লাগা বা ঝিমঝিম করতে পারে। একে বলে ডিরিয়েলাইজেশন (পরিবেশকে অবাস্তব লাগা) বা ডিপার্সোনালাইজেশন (নিজেকে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন লাগা)।
• এই অনুভূতিটিকে মস্তিষ্ক "ব্রেন স্টক" বা "ব্রেন ফ্রিজ" হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
• তীব্র শারীরিক উপসর্গ (বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট) এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় মিলে মৃত্যুভয় তৈরি করে।
মনে রাখবেন: প্যানিক অ্যাটাক নিজে থেকে আপনাকে মেরে ফেলতে পারে না বা আপনার মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করে না। এটি ভয়ানক অস্বস্তিকর এবং ভীতিকর হলেও, এটি সাধারণত শারীরিকভাবে ক্ষতিকর নয়। এখন আপনার কী করা উচিত?
যেহেতু আপনি বারবার এ রকম অনুভব করছেন এবং এটি আপনার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে, তাই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১. প্রথমেই একজন ডাক্তারের সাথে দেখা করুন:
• প্রথমে একজন মেডিসিন বা সাধারণ চিকিৎসকের (জিপি) কাছে যান। আপনার শারীরিক উপসর্গগুলো (ধড়ফড়, মাথা ঘোরা) শারীরিক কোনো কারণে হচ্ছে কিনা (যেমন থাইরয়েড, হার্টের সমস্যা) তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য। রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি ইত্যাদি করতে পারেন। এটি করে আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন যে শারীরিক কোনো সমস্যা নেই। এই নিশ্চয়তা আপনার দুশ্চিন্তা অনেক কমিয়ে দিতে পারে।
২. মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:
• চিকিৎসক যদি নিশ্চিত হন এটি শারীরিক নয়, তাহলে তিনি আপনাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) বা সাইকোলজিস্ট (ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট) এর কাছে পাঠাবেন।
• সাইকিয়াট্রিস্ট ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন, যা প্যানিক অ্যাটকের ফ্রিকোয়েন্সি এবং তীব্রতা কমাতে খুবই কার্যকর।
• সাইকোলজিস্ট কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) এর মাধ্যমে আপনাকে ভয় ও উদ্বেগ মোকাবিলার কৌশল শেখাবেন। সিবিটি প্যানিক ডিসঅর্ডারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর থেরাপিগুলোর একটি।
৩. প্যানিক অ্যাটাক চলাকালীন মোকাবিলার কৌশল:
• মনে রাখুন এটি ক্ষণস্থায়ী: নিজেকে মনে করান, "এটা একটা প্যানিক অ্যাটাক, এটা ৫-১০ মিনিটের মধ্যে কমে যাবে। এতে আমি মরবো না।"
• শ্বাসের দিকে মন দিন: ধীরে ধীরে নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন (৪ সেকেন্ড), কিছুক্ষণ ধরে রাখুন, তারপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে ছাড়ুন (৬-৮ সেকেন্ড)। পেটে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করুন।
• গ্রাউন্ডিং টেকনিক: আপনার পা মাটিতে দৃঢ়ভাবে রাখুন। আপনার চারপাশের ৫টি জিনিস দেখুন, ৪টি জিনিস স্পর্শ করুন, ৩টি শব্দ শুনুন, ২টি গন্ধ পান এবং ১টি জিনিসের স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করুন। এটি আপনাকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনবে।
৪. জীবনযাত্রায় পরিবর্তন:
• নিয়মিত ব্যায়াম: হাঁটাহাঁটি, দৌড়ানো বা যোগব্যায়াম স্ট্রেস কমাতে দারুণ কাজ করে।
• পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
• ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল কমান: কফি, চা, এনার্জি ড্রিংক বা অ্যালকোহল প্যানিক অ্যাটাক ট্রিগার করতে পারে।
• রিলাক্সেশন টেকনিক: ধ্যান, মাইন্ডফুলনেস বা গভীর শ্বাসের চর্চা নিয়মিত করুন।
সংক্ষেপে: আপনার এই অনুভূতি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যার লক্ষণ। এটি আপনার দুর্বলতার লক্ষণ নয়। দয়া করে একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না। সঠিক চিকিৎসা এবং সহায়তার মাধ্যমে আপনি এই ভয় ও আতঙ্ক থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেতে পারেন এবং একটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।





